২০১৮ সালের জুলাই মাস।
আমি তখন ধানমন্ডি থাকি খালাতো ভাইয়ের বাসায়। উদ্ভাস সায়েন্স ল্যাব শাখায় ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং করি। বাবার দেওয়া স্মার্টফোন ভাবির কাছে থাকত। মাঝে মাঝে পড়ার কাজে নিতাম। তো একদিন ফেসবুকে দেখি মেসেজ রিকুয়েস্ট আসছে একটা ছেলের। মেসেজটা খানিকটা এমন ছিল-
"আপনাকে একটা কথা বলার ছিল- হয়তো অনেকের থেকে শুনেই আপনার কান পচে গেছে। বুঝে নিন। Don't think that I'm flirting with you. "
অচেনা একটা আইডি থেকে এমন মেসেজে একটু অবাকই হই। ঘেটে দেখি ফেইক না, রিয়েল আইডি। চেনাজানা কোনো মিউচুয়ালও নাই। তাহলে এ আমাকে পেল কই! কথাবার্তায় ফালতু মনে হল না। রিকুয়েস্ট দিলাম। সাথে সাথে এক্সেপ্ট করে মেসেজ দিল- "Isn't it nice to make someone's day? Thanks for making my day."
যাইহোক, পরে টুকটাক অনেক কথা হল। আমি একটু কাটাকাটা কথা বলতাম সাধারণত। জাস্ট তার প্রশ্নের উত্তর দিতাম। তাকে জানাই আমার রেজাল্ট, স্বপ্ন সব কথা। ১৮ জুলাই এইচএসসি এর রেজাল্ট দিবে- তা নিয়ে কতটা চিন্তায় আছি তাও জানালাম- কেননা ২০১৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা জানেন কতটা বাঁশ সে বছর গেছে সবার। 😒 যাইহোক, সে বলে বসলো আপনি এ+ পাবেন। পেলে অবশ্যই ট্রিট দিবেন। বলেছিলাম- জী দিব অবশ্যই। ভুলটা এখানেই ছিল।
সত্যি সত্যি এ+ পেলাম আর তার ট্রিট নেওয়ার পায়তারা শুরু হল। তাকে বলেছিলাম এডমিশনের পর দেখা করে ট্রিট দিব। আপাতত ফেসবুক অফ। তার আবদার, নাম্বার দিতে হবে তাকে যাতে ফেসবুক ছাড়াও মাঝে মাঝে আমার সাথে কথা বলতে পারে। এক প্রকার জোর করে বসে। ভাবলাম, খারাপ না ছেলেটা, নাম্বার দিলে বিশেষ জ্বালাবে না। দিলাম নাম্বার। তারপর থেকে কথা হত প্রায়ই। যখন মন খারাপ থাকত, চান্স পাওয়া নিয়ে হতাশা কাজ করত- সে ছিল সব হতাশা দূরের একমাত্র টনিক। তো, একদিন সে দেখা করার জন্য খুব করে ধরল। তাকে ট্রিট দিতেই হবে। এক রকম তার জোরের কাছে হার না মেনে পারলাম না। একদিনই তো। দেখা করলে আহামরি কিছু হবে না। তো করলাম দেখা ২৩ জুলাই। কোচিং শুরু ১০ টায় বা ৯ঃ৩০ টায়। আমি বাসা থেকে বের হলাম ৪৫ মিনিট আগে। প্ল্যান হল, দেখা করে ক্লাসে যাব। সীমান্ত স্কয়ারে বসে অপেক্ষা করছি। সে জ্যামে আটকে। কতক্ষণ বসিয়ে রেখে ফোন দিয়ে বলে- আপনি কি কষ্ট করে সিটি কলেজের সামনে আসবেন? রাগ যা হল! তখন এক প্রকার বিরক্তি থেকেই বললাম, পারবনা। অনেক ক্ষণ ধরে বসে আছি। এখানেই আসবেন আসলে। নাহলে আমি ক্লাসে গেলাম, টাইম হয়ে গেছে। বেচারি না পেরে বলল, আচ্ছা আপনি থাকেন আমি আসতেছি দেখি।
সে আগেই এসে গেছে অথচ কেউ কাউকে খুঁজেই পাইনা। আমি এক গেট দিয়ে ঢুকে এক সাইডে বসে, সে তার উলটা দিক দিয়ে মার্কেটের একদম ভেতরে। পরে যাইহোক, দেখা হল। আমি তো দেখে অবাক! ভাবছিলাম একটু বয়স্ক ছাপ হবে চেহারায়- যেহেতু আমার ১১ বছরের বড়। ও মা, যা ভাবলাম তার পুরা উলটা। মোটামুটি কম বয়সী চেহারার ভদ্রছেলে। যাইহোক, প্রচন্ড গরমে আর জ্যামে তার গলা শুকিয়ে কাঠ। এক রকম আবদার করে নিয়ে গেল হেলভেসিয়াতে। সেখানে কোক খেলাম জাস্ট। সাথে করে এনেছিল একটা ছেড়া ডায়েরি। 😶 প্রথম কথাই বলল- "আপনি কি একটু ট্যারা নাকি?"
আমি বললাম- হুম, লক্ষীটেরা।
সে- খারাপ লাগে না কিন্তু। আচ্ছা আপনার দাঁত বুঝি খুব সুন্দর?
আমি একটু ভড়কে গেলাম- মানে?
সে- না আসলে হাত মুখের সামনে রাখছেন তো তাই মনে হল আর কী। দাঁত সুন্দর বলেই মেবি ঢেকে রাখছেন।
রাগ যা হল কিন্তু প্রকাশ করতে পারলাম না।
আমি- যাইহোক, আমার ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। যাই।
সে- ও মা! এখনই কেন?
আমি- অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি। আর ক্লাস বাদ দেওয়া যাবে না।
সে- একটা মানুষ এত দূর থেকে আপনার সাথে দেখা করতে এলো। আর কোল্ড ড্রিংক খাইয়ে বিদায় করে দিবেন?
আমি- 😐
সে- চলেন আশেপাশে কোথাও বসি। রেস্টুরেন্ট এত ভাল লাগে না। খোলা আকাশের নিচে কোথাও বসার জায়গা নাই?
আমি- আচ্ছা, ধানমন্ডি লেক আছে। আমার ভাল্লাগে। যাবেন?
সে- যাওয়াই যায়।
তারপর গেলাম। রাস্তা পার হবার সময় আমার হাত ধরতে গেল। আমি হেচকা টানে হাত সরিয়ে নিলাম। গিয়ে বসলাম লেকের ধারে "লাভার পয়েন্ট" বা এমন কিছু একটা হবে জায়গাটার নাম। সে আমাকে দিল তার ডায়েরিটা পড়তে। তার লিখতে শুরু করা একটা উপন্যাসের অংশ পড়লাম। তাতে একটা কথা লেখা ছিল- "প্রিয়জনের জন্য খরচ করতে পারাও শান্তি"... ঘুরেফিরে সারাদিন এই ডায়লগ শোনা লাগলো আমার। সে আরেক কাহিনী।
হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। দৌড় দিয়ে গেলাম লেকের পাশের বড় ছাউনীর নিচে। অনেকেই ছিল। বোর লাগছিল। কানে হেডফোনের এক পাশ গুজে দিল, বাকিটা সে নিজের কানে গুজে গান ছাড়ল- " বর্ষা মানে না, ঝরছে জলধারা..." কেন জানিনা ওই সময় মনে হল- সব চিন্তা ভুলে কোনো এক স্বর্গলোকে এসে পড়েছি। মুষলধারে বৃষ্টি, সাথে মাটির ঘ্রাণ, জলাধার, পাশে কেউ দাঁড়িয়ে, সাথে এই গান- এই সুর। এটাই হয়তো সারাজীবন চেয়ে এসেছি...।
বিঃদ্রঃ অনেকদিন থেকেই নিজের লাভস্টোরি নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল। আজ লিখে ফেললাম। কেমন লাগে জানাবেন। ভালো লাগলে পুরাটা লিখব একে একে।
