ঈদের দিন আমার ভিতরে একটা ভুঁতুম পেঁচা, ভুতুম পেঁচা ভাব চলে আসে।ভুঁতুম পেঁচা মুখ করে নামাজ পড়তে গেলাম।নামাজ শেষে খুতবা হলো। দোয়া শেষে সবাই কোলাকুলি করছে।আমি পৃথিবীর একমাত্র ব্যাক্তির মতো দাড়িয়ে আছি।আমার চারপাশে এতো মানুষ থাকার পরও পৃথিবীর একমাত্র মানুষ মনে হচ্ছে।আমার চার পাশের সব মানুষ ছায়ার মতো মনে হচ্ছে। জীবনে সব থেকে গভীরতম একটা কষ্ট আমি এখানে পুরোপুরি অচেনা একটা পরিবেশে এসে ঈদ করছি।
কোথা থেকে শরীর ভর্তি গোস্তওয়ালা এক লোক উৎসাহ নিয়ে হেলে দুলে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।বাবাজি আসেন কোলাকুলি করি।তিনি তার বিশাল বুকে আমারকে জড়িয়ে ধরলেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার কঠিন সব টেকনিক ফেলিউর হয়ে গেলো। মানব মস্তিস্ক তার আবেগ ধরে রাখতে পারবে না জেনে অভিনব এক ড্রেনেস ব্যবস্থা করে রেখেছে।যার নাম অশ্রু! আমি নায়াগ্রার মতো অশ্রু বিসর্জন দিতে শুরু করলাম।পৃথিবীর সব অশ্রুর ভিন্ন ভিন্ন কারন থাকে। আমার অশ্রুর বিশেষ কি কোন কারন আছে?
তিনি অনেক সময় জড়িয়ে ধরে রেখে বললেনঃ আরে বাবা তুমি দেখি কেঁদে ফেলেছো! তোমাকে দেখেতো মনে হয় কঠিন প্রকৃতির মানুষ।কঠিন মানুষের কান্না খুব করুন হয় দেখতে।তিনি এরপর যা করলেন তা আমার ভাবনার বাইরে ছিলো।আমার হাতে দু'শো টাকার একটা নোট দিয়ে বললো পিতার কাছে পুত্র-সম সব ছেলেই পুত্র।এতো সুন্দর করে কথা বলতে খুব কম মানুষ দেখেছি। সারা শরীর মাংশ আর চর্বিতে থলথল করছে।থলথলে শরীরের ভিতরের আদ্র হৃদয়টা নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর।
তাকে তার ছেলেরা হাত ধরে নিয়ে গেলো। তিনি যার সাথে কোলকুলি করছেন তাকেই টাকা দিচ্ছেন।আমি দু'শ টাকার নোটটা হাতে ধরে দাড়িয়ে আছি।শয়তান মাথার উপর ল্যান্ড করেছে, ইমারজেন্সি ল্যান্ডি! মেইডি....মেইডি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল শয়তান এয়ারলাইন্স 706 থেকে বলছি। আমাদের ক্যাপটেনের ডাইরিয়া হয়েছে। তিনি ককপিটেই কাজ করে ফেলেছে।অটো পাইলট সিষ্টেম কি ডিস-এনগেইজ করবো কাকা? এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলঃ তোমাদের ক্যাপটেন হারাজাদার হাগুর পরিস্থিতি কি? ওভার! 706ঃ রওজার! আমাদের ক্যাপটেনের হাগু কুলি করার মতো কাকা .... ! আর কোন শব্দ নেই। আমার মাথায় ল্যান্ড করেছে। এটা কোন কাজ হলো?
আমি সবার সাথে বিপুল উৎসাহ নিয়ে কোলাকুলি করছি।হেসে হেসে কথা বলছি।এক জনকে জড়িয়ে ধরে বললাম ভাইজান বলাতো যায় না কখন মরে যাই। সারা দিন ঘরে ভালো লাগেনা আটকা থাকতে। করোনা হইছে তো কি হইছে? বছরে একটা দিন ঈদের নামাজ পড়বো না! এইটা কোন কথা! তাকে সুযোগ না দিয়ে তার হাতে একটা চুমো দিলাম এরাবিয়ান ষ্টাইলে। তিনি চিৎকার করে পাঁচ ছয় ফুট দূরে সরে গিয়ে বললো আফনে এইডা কি করলেন? আফনে করোনার রোগী হইয়া মসজিদে আসছেন আবার সবার সাথে কোলাকুলি করছেন কি সর্বনাশের কথা। লোকজন যে যেভাবে পারছে দৌড়ে পালাচ্ছে। কয়েক জন পাঞ্জাবী খুলে মুখ চেপে ধরেছেন।খুব দ্রুত জায়গা ক্লিয়ার হয়ে গেলো।এই ক্লিয়ার হওয়া খারাপ। গনধোলাইয়ের লক্ষণ।আমি দ্রুত কেটে পরলাম।যাদের সাথে কোলাকুলি করেছি সব কয়টার ঘুম আজ রাতে হারাম হয়ে যাবে।
সারা দিন ভুঁতুম পেঁচা হয়ে ঘরে থেকে সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হয়েছি একা। পাবলিক ক্যালানী দেবে নাতো! এসব চিন্তা ভাবনা করতে করতে পুলিশ লোকজনের জটলা কমানোর জন্য মাইকিং করছে।জ্যোস্না রাতে নদীর চড়ে বসে থাকার আলাদা একটা মজা আছে।জগতের সব কিছু ভুলে গিয়ে পরম প্রকৃতিকে অনুভব করার খুব ইচ্ছা ছিলো।
আমাকে নিতে কয়েকটা বলদ এসেছে। তার একটার নাম জহির অত্যান্ত কামেল ব্যাক্তি। আমাকে বিরাট ভক্তি করে। ভক্তিতে মুক্তি! তাকে বলেছি ঈদের আগের দিন টাক হয়ে তোমার বৌ'কে ভিডিও কল করবে। টাক মাথা নিয়ে তার বৌ'কে কল করতেই তার বৌ হাহাকার গলায় বললো তোমাকে এসব বুদ্ধি কে দেয় হু?
গাড়ীতে উঠেছি পনেরো বিশ মিনিট লাগার কথা। কোন কিছু বোঝার আগেই পিছনের টায়ার ফুশ করে হাওয়া ছেড়ে দিলো। অন্ধকার রাস্তা। কিছু দূরে কয়েকটা দোকান।আমার বিকেলে ক্ষুধা লাগে। মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে।গাছে সাথে কয়েক বার কপালে টাক দিয়ে সেই দোকান গুলির কাছে গেলাম।বিদ্যুৎ নেই সব দোকানে চার্জার লাইট জ্বলছে।কোন দোকানেই তেমন কোন লোক নেই।সব লোক রাস্তার পাশে জড়ো হয়ে কিছু একটা দেখতে।
আমি সিগারেট ধরাতে ধরাতে গেলাম।লোক জন যে জিনিস দেখছে তা হলো কোরবানীর মাংশ অতি বয়স্ক এক লোক বিক্রি করছে। চারশ পঞ্চাশ টাকা কেজি।অনেকেই তার কাছ থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছে।অনেকে তাকে আবার হুমকি- ধামকি দিচ্ছে। আরে চাচা সব হাড্ডি দেন ক্যান? বৃদ্ধ ক্ষীণ গলায় বলছে বড় লোকরা গরীবরে হাড্ডিই দেয় বাজান।
আমি মজা পেয়ে গেলাম।বাঁশের বেঞ্চে বসে তাদের বেঁচা-বিক্রি দেখছি।অল্প বয়সী এক ছেলে লুঙ্গীর ভিতরে ভাজ করে টাকা রাখছে।মাংশ যে যার মতো নেবার পরে কয়েক জন দর্শক আমার মতো তাকিয়ে আছে।
লম্বার জুব্বা পরা একজন দর্শক দাড়িয়ে আছে তার পাশে হাটু গেড়ে বসে এক লোক খুব অনুনয় বিনয় করছে।চাচা তিনশ টাকা রাখেন প্রায় সবি হাড্ডি।বৃদ্ধ না না করছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটা বললো মাংশের জন্য কারো বাড়ি যাইতে পারি না। মেয়েটা মাস্টার্স পড়ে তার টিউশনি নাই।সারা দিন অটো চালানোর পরে যা পাইছি ভাড়া দেবার পর যা থাকবে তা দিয়ে দুইদিন সংসার চালবে না।
বৃদ্ধের কাছে দুই কেজির মতো মাংশ আছে। অটো ড্রাইভারকে বললাম মাংশ আমি নেবো। আমি সাড়ে চারশ দেবো। বৃদ্ধের চোখ আনন্দে চকচক করছে।সে কাপা কাপা হাতে পলিথিনের ব্যাগে আমাকে মাংশ গুলি দিয়ে দিলো।এক হাজার টাকার নোট নেবার পর একশ টাকা ফেরত দিলো।অটো ড্রাইভার মলিন চোখে তাকিয়ে আছেন। একজনের চোখে আনন্দ অন্য জনের চোখ মলিন হয়ে আছে। আহা মানব জাতি! অটো ড্রাইভারকে বললাম আমাকে একটা বেনসন সিগারেট এনে দিতে পারেন? তিনি রোবটের মতো উঠে টাকা নিয়ে দোকানে গেলো। বৃদ্ধের মোমের আলো তখনও নিভু নিভু করছে। সেই আগুনে সিগারেট ধরিয়ে দিলাম।আঁধো অন্ধকারে আমার কাছে মনে হচ্ছে কোন পিতার আদরের মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়ে অপেক্ষা করছে তার হত দারিদ্র পিতা রাতে মাংশ কিনেই বাসায় যাবে।
অটো ড্রাইভারকে ব্যাগটা দিয়ে বললাম।বাসায় নিয়ে যান। তিনি বাজ পরা মানুষের মতো শক্ত হয়ে আছেন।তার চোখে পলক পরছে না। জ্বি বাসায় নিয়ে যান।আমার ঈদের উপহার।মানুষই কেবল মানুষকে উপহার দেয়।
হুজুর টাইপের লোকটা বললঃ আপনি কে?বললাম আমি মাটি।
مِنۡهَا خَلَقۡنٰکُمۡ وَ فِیۡهَا نُعِیۡدُکُمۡ وَ مِنۡهَا نُخۡرِجُکُمۡ تَارَۃً اُخۡرٰی ﴿ সুরা-ত্ব-হা-৫৫
(এই মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে,এই মাটিতেই তোমাকে ফিরিয়ে নেয়া হবে এবং এই মাটি থেকেই পুনঃরায় আবার তোমাকে জীবত করা হবে।)
হুজুরের চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই আমার গাড়ীতে উঠে বসলাম।শ্রাবণের বিষাদময় মেঘে ঢাকা পূর্নিমার রাতে জগতের সমস্ত পরিতৃপ্তি নিয়ে অন্ধকার ভেদ করে আমাকে নিয়ে যারা ছুটছে তারা কোন দিন আমার মতো পরিচয় প্রকাশ করেনা।যখন জানাই আছে মাটিতে মিশে যেতে হবে একদিন।
